সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দলীয় এমপিদের মাঠে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের কড়া জবাব দেওয়ার জন্য দলীয় সংসদ-সদস্যদের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি দলের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সোয়া দুই ঘণ্টার বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, তৃণমূলের মানুষের কাছে সরকারের অবস্থান সঠিকভাবে তুলে ধরুন।
সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ ও সার সংকট নিয়ে দলীয় এমপিদের ব্রিফ করেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা। কৃষিমন্ত্রী সংসদ-সদস্য না হওয়ায় সার নিয়ে বক্তব্য দেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি তুলে ধরেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
সভায় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানান, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অবকাঠামোর কারণে বিদ্যুতের বিদ্যমান সমস্যার দ্রুত সমাধান এখনই সম্ভব নয়। তবে শহর ও গ্রামের মধ্যে লোডশেডিংয়ের ভারসাম্য রক্ষায় সরকার কাজ করছে।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী জানান, দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সরবরাহ প্রক্রিয়ায় যেন কোনো ধরনের নাশকতা না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। পলাতক ডিলারদের স্থানে নতুন ডিলার নিয়োগ এবং ইউএনও-কে আহ্বায়ক করে উপজেলায় মনিটরিং কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দলীয় এমপিদের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, দেশে ‘মব কালচার’ সহ্য করা হবে না। এতে দলের কেউ যুক্ত থাকলেও ছাড় দেওয়া হবে না এবং আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।
বৈঠকে কয়েকজন সংসদ-সদস্য বিগত সরকারের আমলে বিরোধী দলের ওপর নির্যাতনকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের বহাল থাকার অভিযোগ তুললে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের তালিকা দেওয়ার আহ্বান জানান।
সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী সরকারের বিরুদ্ধে চলা অপপ্রচারের জবাব দেওয়ার জন্য মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থাকার পরামর্শ দেন। তিনি জানান, বিদ্যমান সংকট নিয়ে মন্ত্রীরা যে ব্রিফ করেছেন, তার সঠিক বার্তা যেন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। যাতে সরকার সম্পর্কে মানুষ ভুল না বোঝে। এছাড়া আগামী ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে মন্ত্রী ও সংসদ-সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় উপস্থিত থাকার কড়া নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন (বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ) উপলক্ষ্যে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া এবং দলের ভেতর যেন কোনো ধরনের কোন্দল তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে সব সংসদ-সদস্য ও মন্ত্রীকে নিজ নিজ এলাকায় উপস্থিত থেকে কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে সরকারের বিরুদ্ধে যেসব প্রচার, অপপ্রচার বা প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার এবং এর জবাব দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকারের সঙ্গে বিদ্যুৎ-জ্বালানি, সার ও গ্যাস সংকটের বিষয়ে মানুষকে অবহিত করার জন্যও দলীয় সংসদ-সদস্যদের নির্দেশ দেন তিনি। এছাড়া আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দল সমর্থিত প্রার্থীকে জয়ী করতে সংসদ-সদস্যদের ভূমিকা রাখার নির্দেশনাও দেন সংসদ নেতা তারেক রহমান। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদে দল সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে এবং ‘সৎ ও যোগ্য’ প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
একাধিক সংসদ-সদস্য বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের সতর্ক করে বলেছেন, যেহেতু আগামী নির্বাচনে কোনো দলীয় প্রতীক থাকছে না, সেক্ষেত্রে ত্যাগীদের বাদ দেওয়া ঠিক হবে না। অনেক এমপি তাদের পছন্দের প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তরুণদের সামনে আনছেন, এটা যেন তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে করা হয়। যাতে তৃণমূল পর্যায়ে কোনো ক্ষোভ বা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে না হয়। দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে কোনো ধরনের দূরত্ব বা বিরোধ তৈরি করা যাবে না বলেও সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সংসদ-সদস্য বলেন, সাম্প্রতিক নানা ইস্যুতে সংসদ-সদস্যরা প্রশ্ন করলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা তার জবাব দেন। সারের সংকট কাটাতে আগামী দু-একদিনের মধ্যেই নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টরা কাজ শুরু করেছেন। সার সরবরাহ ও বিতরণ যাতে যথাযথভাবে হয় সেদিকেও সরকার কড়া নজর রাখছে। এ বিষয়ে কেউ যাতে অপপ্রচার চালাতে না পারে, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের সহযোগিতা কামনা: এদিকে সভা শেষে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আগে বিরোধী দলের কোনো সদস্যের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদে যাওয়ার সুযোগ নেই। অতীতেও এমনটি কখনো হয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি। চিফ হুইপ জানান, জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বৃহস্পতিবার সম্পত্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত আইন, গুমসংক্রান্ত আইন এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত আইন উত্থাপন করা হবে। তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধনের ক্ষেত্রে বিরোধী দলসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
শেরপুর নিউজ প্রতিবেদকঃ 























