“মুনসী সাইফুল বারী ডাবলু”
প্রায় ৩৫ বছর পর প্রতিদ্ব›িদ্বতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়েছেন। মির্জা ফখরুলের প্রতিদ্ব›দ্বী ছিলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল অব: অলি আহমদ। তিনি পেয়েছেন ৮৮ ভোট। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সমর্থনে তিনি প্রার্থী হন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে মির্জা ফখরুল বিএনপির মহাসচিবের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। আনুষ্ঠানিক শপথের পর পাঁচ বছরের জন্য বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন তিনি।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্বাচিত ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। এরপর রাষ্ট্রপতি পদে নতুন নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেয় সরকার। তফসিল ঘোষণার পর বিএনপি দলীয়ভাবে মির্জা ফখরুলকে প্রার্থী করেন।রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের নির্বাচিত হওয়া তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ছাত্ররাজনীতি থেকে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকার এবং জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন পর্যায় পেরিয়ে তিনি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পৌঁছেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় ষাটের দশকে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন তিনি। ওই সময় রাজনৈতিক কর্মকান্ডের কারণে তাকে কারাবরণও করতে হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরিচিত নাম। নাটকের মঞ্চ থেকে ছাত্র আন্দোলন, শিক্ষকতা থেকে জাতীয় রাজনৈতিক নেতা। বর্ণাঢ্য এই জীবনে দীর্ঘ সময় তিনি মানুষের সঙ্গে রাজপথে ছিলেন। ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর এবার ২০২৬ সালে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে মির্জা ফখরুল ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করার পর তিনি ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (শিক্ষা ক্যাডারের) সদস্য হিসেবে প্রভাষক পদে কর্মজীবন শুরু করেন।
তিনি বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে সফল শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্য সরকারি দায়িত্বের মধ্যে, তিনি বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনে কাজ করেন। এছাড়াও তিনি ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও কাজ করেন। ১৯৮২ সালে এস এ বারী পদত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম, যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন। বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊধর্বতন কর্মকর্তা হিসেবে অবসরে গেছেন। এই দম্পতির দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ এবং মির্জা সাফারুহ। শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন এবং এই প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি বর্তমানে ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
১৯৮৬ সালে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে প্রবেশ করেন মির্জা ফখরুল। এর দুই বছর পর তিনি ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। পরে ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতেও দায়িত্ব পান। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করলেও সেবার জয়ী হতে পারেননি। পরে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর মির্জা ফখরুল বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভায় কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের পর তিনি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন। এর আগে তিনি জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। সেনাসমর্থিত তত্ত¡াবধায়ক সরকারের সময়ে দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক চাপ এবং দলীয় অভ্যন্তরে নানা সংকট দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলেও বিএনপি রাজনৈতিকভাবে চাপে ছিল। এই সময়ে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়লেও তিনি দলের হয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। ২০০৯ সালের জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন তিনি। ২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন। ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি আন্দোলনে গেলে দলটির শীর্ষ নেতাদের অনেকে গ্রেপ্তার ও মামলার মুখে পড়েন। এর মধ্যেই ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ মির্জা ফখরুল বিএনপির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন। ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর এবং তারেক রহমান দেশের বাইরে অবস্থান করায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বে মির্জা ফখরুলের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওই সময় দেশের ভেতরে থেকে তিনি দলের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। রাজনৈতিক কর্মকান্ডের কারণে বিভিন্ন সময়ে তাকে গ্রেপ্তার ও মামলার মুখোমুখিও হতে হয়েছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মির্জা ফখরুলকে তুলনামূলকভাবে নম্র, ভদ্র ও সংযত রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক। অন্য দলের নেতাদের নিয়ে আক্রমণাত্মক মন্তব্য না করে ভিন্নমতকে সম্মান করার প্রবণতার কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনেও তার আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত। রাষ্ট্রপতি পদে তার নির্বাচিত হওয়ার পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ আশা করছেন, দলীয় রাজনীতির গন্ডির বাইরে গিয়ে তিনি রাষ্ট্রের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী এবং রাজনীতিক। তিনি পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্যও হন। এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভাতেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তার ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনিও এর আগে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র ছিলেন। রাজনীতির সঙ্গে মির্জা ফখরুলের পারিবারিক সম্পর্ক আরও পুরোনো। তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন জাতীয় পর্যায়ের পরিচিত রাজনীতিক এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার। ফলে রাজনীতি তার কাছে অপরিচিত কোনো জগত ছিল না বরং পারিবারিক পরিবেশেই রাজনীতির নানা অনুষঙ্গের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। তবে পরবর্তী সময়ে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় তিনি গড়ে তোলেন দীর্ঘ সংগ্রাম, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে। পাশাপাশি ছাত্রজীবনে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেও যুক্ত ছিলেন মির্জা ফখরুল। নাট্যচর্চা, মঞ্চে অভিনয় এবং আবৃত্তির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা শেষে দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হলো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সাথে আমরাও আশাকরি তিনি দলীয় রাজনীতির গন্ডির বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবেন । আমরা তার ভবিষ্যত সাফল্য,সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।
শেরপুর নিউজ প্রতিবেদকঃ 
























